Tuesday 1st of December, 2020 | 2:23 AM

কবি নজরুলের জীবনী (পর্ব-২)

জুবায়ের আহমেদ জীবন
  • শুক্রবার, ২০ মার্চ, ২০২০
কবি নজরুলের জীবনী (পর্ব-১২)
কবি নজরুলের জীবনী (পর্ব-১২)

কবি নজরুলের জীবনকথা (পর্ব-২)

জুবায়ের আহমেদ জীবন
(গত সংখ্যার পর)
স্কুলের বাঁধাধরা পড়াশোনা ভাল না লাগায় তিনি দিন- ক্ষণ বুঝে বাড়ি থেকে পালিয়ে মহকুমা শহর আসানসোলে যান। সেখানে একটি মাংসের দোকানে পরে রুটির দোকানে এক টাকা বেতনে চাকরি নেন। তবে তার গানের গলা ছিল অসাধারণ সুন্দর। তাই রুটির দোকানে কাজের ফাঁকে সুর করে গান গাইতেন, পুঁথি পড়তেন। রুটির দোকান হওয়ায় দৈনন্দিন সেখানে নানা জনের আনাগোনা থাকত আর ভাল গান গাওয়ার সুবাদে অনেকের
সাথে নজরুলের পরিচয় হয়। এমনিভাবে নজরুল আসানসোলের এক দারোগার সাথে পরিচিত হয়। সেই দারোগা নজরুলের সুরেলা কন্ঠে গান শুনে মুগ্ধতায় ‘থ’ বনে যায়। তার অস্বাভাবিক প্রতিভা দেখে আসানসোলের সেই দারোগা কাজী রফিজ উল্লাহ তার নিজ বাড়ি ময়মনসিংহ জেলার দরিরামপুরে নিয়ে আসেন। সেখানে স্কুলে দুখুকে ভর্তি করান। কিন্তু কালকতক যেতে না যেতেই নজরুলের চঞ্চল হৃদয়ে আপন গ্রামের জন্য প্রীতির জোয়ার উত্থলে ওঠে। ফিরে আসেন সবুজ- শ্যামল চিরচেনা চুরুলিয়া গ্রামে। শিয়ারশোল উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা করতে থাকেন।
কবি নজরুল এত দুঃখ- কষ্টসহ আর্থিক দৈন্যতার মাঝে নিজের জীবনকে সার্থক করে তুলেছেন। তিনি ছিলেন অগাধ সাহসী ও স্পষ্টভাষী। তাই কোন বিপদই তাকে তার লক্ষ্যপাণে এগিয়ে যাওয়ার পথে বাধা হতে পারেনি, তাকে থামাতে পারেনি। লেটো দলে যোগদানের পর থেকেই তিনি পরিচিত হয়েছেন বিভিন্ন যায়গার সাথে, মানুষের সাথে, জেনেছেন- দেখেছেন মানুষের সংগ্রামী জীবনকথা, মিশেছেন পরিবেশের সাথে। তিনি তার সুরেলা কন্ঠ আর বাগ্মীতার কারণে সংগীত জগতের মানুষের সাথে খুব সহজেই পরিচিত হয়েছেন সেই সাথে তাদের প্রিয়পাত্রও হয়েছিলেন বটে। তবে তার এই লেটো জীবনও মসৃন ছিলনা বরং ছিল এক রণাঙ্গন।
১৯১৪ সন। প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে সমগ্র ইউরোপে। যুদ্ধের মর্মান্তিকতা দেখে কবি বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়েন; তার হৃদয়ে জ্বলে ওঠে অমানবিকতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। তিনি ক্ষোভে উদ্ব্যেলিত হয়ে ওঠেন মানবসভ্যতার এই বর্বরোচিত আচরণে বিরুদ্ধে; তার হৃদয় গর্জে ওঠে বিদ্রোহীতার উজ্জ্বল অগ্নিবাণে। সে সময় ৪৯ নম্বর বাঙ্গালি পল্টন বিশ্বযুদ্ধে যোগ দিচ্ছিল। যুদ্ধের আহ্বান শুনে স্কুল থেকে পালিয়ে যায় নজরুল। সেখান থেকে সরাসরি ৪৯ নম্বর বাঙ্গালি পল্টনে সৈনিক হিসেবে যোগ দিয়ে চলে যান করাচীতে। নজরুল একজন সুদক্ষ ও সুগুনী যোদ্ধা ছিলেন। সেনাবাহিনীতে নিজের যোগ্যতার পরীক্ষা দিয়ে তিনি “হাবিলদার” পদে পদোন্নতি লাভ করেন। সৈন্যদলে থাকাবস্থায় তাকে পেশোয়ার থেকে মেসোপটেমিয়া পর্যন্ত যেতে হয়। এর ফলে তিনি বিভিন্ন দেশ সম্পর্কে ব্যাপক অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।
যুদ্ধারত অবস্থায় তার কবিত্বশক্তির প্রকাশ পায়; খুব অল্পবয়সেই তিনি মুখে মুখে ছন্দ মিলিয়ে পদ্য রচনা করতেন। গ্রামের লেটোদলে থাকাবস্থায় অনেক পালা গানও রচনা করেছেন।
আমরা অখন্ড নজরুলকে চিনি; পূর্ণাঙ্গ নজরুলকে চিনি না। তিনি শুধু কবি নন, সাথে একজন ঔপন্যাসিক, গল্পকার, নাট্যকার, গানের রচয়িতা- সুরকার ও গায়ক, ধ্রুপদী শিল্পী, সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক, সম্পাদক, সৈনিক, ইসলামী গানের স্রষ্টাও বটে। সাথে সাথে তিনি প্রেমিক- স্বামী ও পিতা। তার বিচিত্র জীবনীর দিকে দৃষ্টি দিলে নজরে পড়ে-
রেলগার্ডের ম্যাচিয়ার, মাংস ও রুটির দোকানের বয়, বাসার চাকর, মুয়াজ্জিন, মসজিদের ইমাম, মাজারের খাদেম, সৈনিক, সুরকার, সংগীত পরিচালক, চলচ্চিত্র পরিচালক, জেলের কয়েদি প্রভৃতি।
বাংলা সাহিত্যে ধূমকেতুর মতোই তার আবির্ভাব। পচনধরা প্রথাগত সমাজকে ভেঙ্গেচুরে স্বাস্থ্যকর নতুন এক সমাজ নির্মাণ করাই তার স্বপ্নছিল। তাই তিনি বিদ্রোহ করেছিলেন সকল অন্যায়, অসত্য, শোষণ- নির্যাতন আর দুঃখ- দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে। ঔপনিবেশিক শাসন- শোষণ এবং পরাধীনতার গ্লানি থেকে জাতিকে মুক্ত করতে তিনি কলম ধরেছিলেন। কবিতা লেখার অপরাধে তিনি কারারুদ্ধ হন। তবে বন্দি করেও তাকে ও তার লেখাকে থামানো সম্ভব হয়নি। অবশ্য দুঃখ, দারিদ্র্যতা এবং সংগ্রামের মধ্যদিয়ে অতিবাহিত হয়েছে তার জীবন। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় তিনি অবাধে বিচরণ করেছেন। (চলবে)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
©  2019 All rights reserved by  dailydinajpur.com
Theme Dwonload From Ashraftech.Com
ThemesBazar-Jowfhowo