Tuesday 1st of December, 2020 | 3:07 AM

কবি নজরুলের জীবনী (পর্ব-১০)

জুবায়ের আহমেদ জীবন
  • শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল, ২০২০
কবি নজরুলের জীবনী (পর্ব-১২)
কবি নজরুলের জীবনী (পর্ব-১২)

কবি নজরুলের জীবনী (পর্ব-৯)

কবি নজরুলের জীবনকথা (পর্ব-১০)

জুবায়ের আহমেদ জীবন   
 
(গত সংখ্যার পর)
জীবনের প্রথমার্ধ থেকেই নজরুল বেশ স্বাধীনচেতা ছিলেন। রুশ বিপ্লবের আগে থেকে তার বিশ্বাস ছিল বিপ্লবের মাধ্যমে অর্জিত হবে দেশের স্বাধীনতা। কবির স্কুল জীবনের বন্ধু সাহিত্যিক শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় উল্লেখ করেছেন, ‘নজরুল যুদ্ধবিদ্যা শিখে এসে ভারতবর্ষে এক বিরাট সৈন্যবাহিনী গঠন করে, তারপর দেশ থেকে ইংরেজ তাড়াবে তার এই গোপন মতলবের কথা সে আমাকে একদিন বলেছিল।’ শিয়ারশোল স্কুলে নজরুলের শিক্ষক ছিলেন নিবারন ঘটক৷ বিপ্লবী দল “যুগান্তর” এর সদস্য ছিলেন তিনি এবং দলের হয়ে বিপ্লবের জন্য কর্মী সংগ্রহ করা থেকে শুরু করে কর্মীদের দীক্ষাও দিতেন। এই নিবারন ঘটকের একনিষ্ট অনুসারী ছিলেন নজরুল। কিন্তু ১৯১৭ সালের জানুয়ারি মাসে বিপ্লবী দলের সাথে সম্পৃক্ততার অপরাধে গ্রেফতার হন নিবারন ঘটক, বিচারে পাঁচ বছরের কারাদন্ড হয় তার। নিবারব ঘটক আটক হওয়ার পর  দলের অন্য কর্মীদের সনাক্ত করার জন্য গোপনে তদন্ত চালায় স্কুল কতৃপক্ষ। তখন নিবারনের ঘনিষ্ট ছাত্র হিসেবে নজরুল ছিল সন্দেহের তালিকায়। যদিও তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তবুও তাকে প্রাথমিকভাবে সন্দেহ করা হয় এবং কয়েক মাসের জন্য তার ছাত্রবৃত্তি স্থগিত রাখা হয়।
যুগান্তর কর্মী ও নজরুলের জীবনীকার প্রাণতোষ চট্টোপাধ্যায়ের ভাষ্যে, “আমি দুজনেরই কাছের মানুষ হিসেবে এটা বুঝেছিলাম যে নজরুল যুগান্তর দলের কর্মী ছিলেন কিন্তু কাজ করবার মুখেই নিবারণ ঘটক হয়ে গেলেন গ্রেফতার। ” পরে নজরুল নিজেও মুজাফ্ফর আহমেদের কাছে স্বীকার করেছিলেন, ‘নিবারণ ঘটকের মতবাদে একসময় দারুণভাবে আকৃষ্ট হয়েছিলেন তিনি।’
এক্ষণে নিশ্চয়ই এটুকু অনুমান করা দুঃসাধ্য হবে না যে সেই ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষে সেই সময় করাচিতে সেনাবাহিনীর ভেতরে ও বাইরে বিপ্লবীদের একটা দল তৎপর ছিল, যাদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল নজরুলের এবং সেনাবাহিনীর এই বিপ্লবী গোষ্ঠীর মাধ্যমেই নিয়মিতভাবে বিপ্লবের সংবাদ সংগ্রহ করতেন নজরুল। অধিকন্তু তৎকালের অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও সেনা সেন্সরশিপের কারণে বাংলাদেশ থেকে সংবাদ ও বইপত্র সরাসরি নজরুল পর্যন্ত পৌঁছা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার ছিল। বাঙালি পল্টনের সৈনিক ও স্বদেশী আন্দোলনের বিভিন্ন লেখা থেকে জানা যায়, প্রথম মহাযুদ্ধকালে বাঙালি পল্টনসহ বেশ কিছু ভারতীয় সেনা ইউনিটে পরিকল্পিতভাবে অনুপ্রবেশ ঘটেছিল বিপ্লবীদের।
 কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যকর্মের দিকে তাকালে রুশ বিপ্লবের প্রভাব বেশ ভালভাবেই লক্ষ্য করা যায়। রুশ বিপ্লবের প্রভাবান্বিত দু’টি রচনা বিশেষ দৃষ্টান্তমূলক। এর মধ্যে প্রথমটি গল্প এবং দ্বিতীয়টি কবিতা। “ব্যথার দান” কবির প্রথম দিকের লেখা গল্প। রুশ বিপ্লবের মাত্র দুই বছর পর ১৯১৯ সালে পল্টনে বসে তিনি এ গল্পটি লেখেন। আর এর প্রধান দুই চরিত্র দারা ও সয়ফুল মুলক। এদের ভারত থেকে লালফৌজে যোগ দেওয়া সৈনিক হিসেবে এ গল্পে দেখিয়েছেন তিনি। যেমন, গল্পে সয়ফুল মুলকের কন্ঠে শোনা যায়, “ঘুরতে ঘুরতে শেষে লালফৌজে যোগ দিলুম। এ পরদেশিকে তাদের দলে আসতে দেখে তারা খুব উৎফুল্ল হয়েছে। মনে করছে, এদের মহান নিঃস্বার্থ ইচ্ছা বিশ্বের অন্তরে অন্তরে শক্তি সঞ্চয় করছে। আমায় আদর করে এর দলে নিয়ে বুঝিয়ে দিল যে কত মহা প্রাণতা আর পবিত্র নিঃস্বার্থতায় প্রণোদিত হয়ে তারা উৎপীড়িত বিশ্ববাসীর পক্ষ নিয়ে অত্যাচারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে এবং আমিও সেই মহান ব্যক্তি সংঘের একজন।” উল্লেখ্য, ‘ব্যথার দান’ গল্পে ‘লালফৌজ’ ঝুঁকিপূর্ণ মনে হওয়ায় প্রকাশকালে তা পাল্টে দেওয়া হয়েছিল।
১৯২০ সালে পল্টন থেকে ফিরে এলেন নজরুল। ১৯২২ সালে রুশ বিপ্লবকে ভারতে আহ্বান করে লিখলেন বিখ্যাত “প্রলয়োল্লাস” কবিতা। আর এই কবিতায় রুশ বিপ্লবকে তুলনা করা হলো “প্রলয়” শব্দের সঙ্গে। এই কবিতার “আসছে এবার অনাগত প্রলয় নেশার নৃত্যনপাগল/ সিন্ধু পারের সিংহদ্বারে ধমক হেনে ভাঙল আগল”- এই পঙক্তিতে উন্মোচিত হয়েছে রুশ বিপ্লবের স্বরূপ। (চলবে)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
©  2019 All rights reserved by  dailydinajpur.com
Theme Dwonload From Ashraftech.Com
ThemesBazar-Jowfhowo