Monday 30th of November, 2020 | 5:10 PM

কবি নজরুলের জীবনী (পর্ব-১২)

  • শনিবার, ৯ মে, ২০২০
কবি নজরুলের জীবনী (পর্ব-১২)
কবি নজরুলের জীবনী (পর্ব-১২)

কবি নজরুলের জীবনী (পর্ব-১১)

কবি নজরুলের জীবনকথা (পর্ব-১২)

জুবায়ের আহমেদ জীবন 
 
 
(গত সংখ্যার পর)
রণক্ষেত্র থেকে কবি ফিরে এলেন। অতঃপর ১৯২৪ সালের ২৫শে এপ্রিল আশালতা সেন গুপ্ত ওরফে প্রমীলা দেবীকে বিয়ে করেন। বিয়ের দিন দু’য়েক পর তথা ৩০শে এপ্রিল কবি জসীমউদ্দিন কাজী নজরুল ইসলামকে প্রশ্ন করেছিলেন- নজরুল তুমি কি এমন দেখলে আশালতার (প্রমীলা) প্রতি যে তাকেই বিয়ে করলে? তুমি তো আরো ভাল চেহারার মেয়ে বিয়ে করতে পারতে? জবাবে সেদিন নজরুল দক্ষ প্রেমিকের মতো বলেছিলেন- কি দেখে যে তাকে বিয়ে করেছিলাম তাতো আমি জানিনে ভাই, তবে তার চোখের মায়া তো আমায় ছাড়েনা। কবির এমন প্রেমতা সত্যিই বিস্ময়কর!
করাচী থেকে ফিরে নজরুল কলকাতায় পা রেখেছিলেন চৈত্র্য মাসের কাঠ ফাটা আর বুকের ছাতি ফাটা হাসফাস গরমে। কাপড়- চোপড় আর বই পত্রের বোঝা ছাড়া তিনি সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন দু’টি সাময়িক পরিচয়- এক. তিনি রীতিমতো কুর্দিপড়া একজন হাবিলদার,  দুই. তিনি একজন মুসলিম গদ্য লেখক; যিনি আরবী- ফারসি- উর্দু মেশানো বাংলায় গল্প লেখেন কেবল মুসলমান নর- নারীদের নিয়ে। মূলত এবার নজরুল ইসলামের নানাভাবে ধর্ম চিন্তার বিবর্তন ঘটে; কখনো হিন্দু ও অন্যান্য আবার কখনোবা ইসলাম ধর্মের মতাদর্শি হয়েছেন। বিশেষত শেষ পর্যন্ত কাজী নজরুল ইসলাম নিজ ধর্মের দিকেই ঝুঁকে পড়েন। যদিও বিভিন্ন সময় তিনি দ্বি-ধর্মী কবিতা, গল্প, উপন্যাস ইত্যাদি রচনা করেছেন।
বছর দু-একের মধ্যেই কবি তার এই দুই পরিচয়কে ভুল প্রমাণ করলেন। তিনি প্রমাণ করলেন যে তিনি ইংরেজদের অনুগত হাবিলদার নন, তিনি বিদ্রোহী, স্বৈরাচার বিরোধী। আর তিনি গদ্য লেখক নন, আপাদমস্তক তিনি একজন কবি এবং তিনি শুধু মুসলমানদের কবি নন তিনি মানুষের কবি। তিনি কলকাতায় ছদ্মবেশে নয়, ভীত হয়েও প্রবেশ করেননি। তিনি নিজ হাবিলদার পরিচয়কে খাঁটি ও গৌরবের বলে গণ্য করতেন। আর তিনি অসাম্প্রদায়িক হওয়া সত্ত্বেও তার মুসলিম স্বরূপ ছিল ষোল আনাই।
নজরুল ইসলাম জন্মগ্রহণ করেন মুসলিম পরিবারে। কিন্তু সে পরিবার বাকী আর পাঁচটা পরিবারের মতো নয়। সে পরিবার ছিল রক্ষণশীল মুসলিম ও ইসলামি শিক্ষার দিকে ছিল বেশ প্রাধান্য। পাঠ চুকানোর লক্ষ্যে তিনি প্রথম ছবক নিয়েছিলেন একটি মক্তবে, কোন অসাম্প্রদায়িক বা ধর্মনিরপেক্ষ পাটশালায় নয়। সেখানে ইসলামী সাহিত্য নিয়ে এতো পরিমাণ অধ্যয়ন করেছিলেন যে সহপাঠীদের শিখতে সাহায্য করতেন। পিতার ইন্তেকালের পর এই ইসলামী শিক্ষা নিয়েই নজরুল অভাবী সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে মসজিদের খাদেম, মুয়াজ্জিন ও ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেই সাথে কখনো স্থানীয় এক মাজারে খাদেমের কাজও করেছেন। বলাবাহুল্য, তিনি খুব অল্প বয়সে ইসলামী শিক্ষায় বেশ পাকাপোক্ত হয়ে ওঠেন। তাই তিনি সাহিত্য জগতের পথে যাত্রা শুরু করেন মুসলিম নর- নারীদের নিয়ে। কিন্তু তার এই অসাম্প্রদায়িতার মনোভাব তৈরি হয় তার বড় হয়ে ওঠা পরিবেশ থেকেই। বিশেষ করে কলকাতায় ফেরার পর থেকে তিনি যাদের সাথে বাস করেন, যেসব কাজ করেন এবং যেসব পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি করেন সেসবই তাকে অসাম্প্রদায়িকতার দিকে ঠেলে দেয়। এমনকি আরবী- ফারসি- উর্দু মেশানো ‘মুসলমানি’ ভাষার পাশাপাশি তিনি এমন এক ভাষা শিখেছিলেন যেখানে ছিল অসংখ্য পৌরাণিক বিষয়ের উল্লেখ। মূলত নজরুল পৌরাণিক বিষয়- বস্তু দিয়েই রাতারাতি পাঠক মনে আসন করে নেন। সেই সাথে তিনি পাঠকের হৃদয় জয় করেন ধর্মের মন্ত্রে নয়, মানবতার গান গেয়ে। অবশ্য তার জনপ্রিয়তার আরেকটি প্রধাণ কারণ ছিল নির্ভীক রাজনৈতিক অবস্থান।
নজরুল ইসলাম প্রথম লিখিতভাবে ভারতবর্ষের স্বাধীনতার দাবী জানিয়েছিলেন। তিনি ঠিক এমন সময় স্বাধীনতার কথা উত্থাপন করেছিলেন যখন গোটা দেশ স্বাধীনতার পিপাসায় ছটফট করছিল। কিন্তু কেউ সাহস করে মুখ ফুটে ঠোট দুটো নাড়িয়ে বলতে পারেনি ‘স্বাধীনতা চাই’ কথাটি। এমতাবস্থায় নজরুল তার অস্ফুটতাকে কাটিয়ে হিম্মত বুকে লিখে গেলেন গোটা দেশবাসীর মনের বাসনার কথা।
কবির বিদ্রোহী লেখনি আর জনমনের ভাবাবেগপূর্ণ প্রতিবাদ ও দাবী জনমনে গেথে থাকলেও রাজনীতির ময়দানে তার বহিঃপ্রকাশ হয় হিতের বিপরীত। ১৯২৬ সালে তিনি স্বরাজ দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন কিন্তু জনমনে আসীন হওয়া সত্ত্বেও পাঁচজন প্রতিদ্বন্দ্বির মধ্যে চতুর্থ হয়ে পরাজিত হন। (চলবে)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
©  2019 All rights reserved by  dailydinajpur.com
Theme Dwonload From Ashraftech.Com
ThemesBazar-Jowfhowo