Tuesday 1st of December, 2020 | 3:01 AM

কবি নজরুলের জীবনী (পর্ব-৬)

জুবায়ের আহমেদ জীবন
  • বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২০
কবি নজরুলের জীবনী (পর্ব-১২)
কবি নজরুলের জীবনী (পর্ব-১২)

কবি নজরুলের জীবনকথা (পর্ব-৬)

জুবায়ের আহমেদ জীবন
(গত সংখ্যার পর)
নজরুলের একাধিক নারীর সাথে প্রণয় ঘটেছিল ঠিকি কিন্তু চিরায়ত অন্যান্যদের থেকে ফজিলাতুন্নেসার ব্যাপারটি ছিল একেবারেই ভিন্ন। এই একটি সম্পর্ক রূঢ় প্রত্যাখ্যানের রূপটি চিনিয়েছিল কবিকে। সমুদ্রের ঢেউভাঙ্গা জলের মতোই ফজিলাতুন্নেসার চরণ স্পর্শ করতে চেয়েছিল নজরুলের এই প্রেম প্রস্তাবের নিবেদন, কিন্তু এক আশ্চর্য উপেক্ষার শক্তি ছিল এই তরুণীর। তিনি কবির দিকে ফিরেও চাইলেননা বরং ব্যঙ্গ- বিদ্রুপ- অবহেলায় ক্ষত- বিক্ষত করেছিলেন নজরুলের কাব্যাত্মক ও প্রেমময় সেই হৃদয়কে।
কবি নজরুলের প্রেমসংক্রান্ত অদ্যাপিত মোট আটটি চিঠি পাওয়া গিয়েছে। কাজী মোতাহার হোসেনকে লেখা সাতটি এবং ফজিলাতুন্নেসাকে লেখা একটি চিঠিতে যে ব্যথিত- অপমানিত, গ্লানি জর্জরিত নজরুলকে পাওয়া যায় তা তুলনা রহিত। বন্ধু কাজী মোতাহার হোসেন চিঠিগুলোর প্রাপক হলেও তিনি চাইতেন চিঠিগুলো ফজিলাতুন্নেসা পড়ুক। তার চিঠিগুলোতে মূলত সে উদ্দেশ্যের কথাই উদ্ধৃত হয়েছে।
নিশ্চয় পাঠক মনে এবার প্রশ্নের উদয় হচ্ছে যে, যে নারীর জন্য আমাদের বিদ্রোহী কবি এতটাই বেদনাসিক্ত ও মর্মাহত হয়েছেন কে সেই নারী? আর তার সাথে কবির সাক্ষাৎইবা হলো কিভাবে? আর কবির এই প্রেয়সি কেমন বশোংদ্ভুত ছিলেন বা কেন কবির প্রেম নিবেদনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে কবিকে মনোকষ্টে নিপতিত করেছিলেন? চলুন তাহলে সেই শ্যামাঙ্গী তরুণীর পরিচয় ও উপরিক্ত প্রশ্নগুলোর সমাধানে এগিয়ে যাই। নজরুলের সেই প্রেম কুমারী, প্রেমরাণী ফজিলাতুন্নেসা ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মুসলিম ছাত্রী। তার বাবা আবদুল ওয়াহেদ খান টাঙ্গাইলের করটিয়ার জমিদার বাড়িতে চাকরী করতেন। তবে আনুমানিক বলা হয় যে, ঢাকায় রেখে মেয়েকে পড়ানোর মতো আর্থিক সংগতি তার ছিলনা। কিন্তু ফজিলাতুন্নেসার জীবনের লক্ষ্য যেমন ছিল সুদৃঢ়; সেই লক্ষ্য পূরণের জন্য তার সাহস ও একাগ্রতাও ছিল বিস্ময়কর।
সেই সময়ে রক্ষনশীল সমাজে একজন মুসলিম মেয়ের পক্ষে ঢাকায় একা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়া কতটা দুরূহ ব্যাপার ছিল তা বর্তমান সময়ে  কল্পনা করাও কঠিন। যদিও তার বোন শফিকুন্নেসা মাঝে মাঝে এসে তার সাথে থাকতেন। কিন্তু বৃত্তি নিয়ে যে ফজিলাতুন্নেসা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু লেখাপড়া করছে তা নয়; গণিতশাস্ত্রে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান পেয়ে তার মেধারও প্রমাণ রেখেছেন।
১৯২৮ সালে মুসলিম সাহিত্য সমাজের দ্বিতীয় বার্ষিক সম্মেলনে অতিথি হিসেবে ঢাকায় আসেন কবি নজরুল। এই সংগঠনের সম্পাদক কাজী মোতাহার হোসেনের বর্ধমান হাউসের বাড়িতে আতিথ্য গ্রহণ করেন তিনি। এ সময় ফজিলাতুন্নেসার সাথে তার পরিচয় হয়। নজরুল হস্তরেখা দেখে ভাগ্য গণনা করতে পারেন শুনে নিজের ভাগ্য ও ভবিষ্যত জানতে আগ্রহী হয়েছিলেন ফজিলাতুন্নেসা। সোৎসাহে বন্ধু মোতাহারকে নিয়ে নজরুল উপস্থিত হন তার বাসায়। পরিচয় ও হস্তরেখা বিশ্লেষণ পর্যন্ত বিষয়টা ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু এর পরের ঘটনা বেশ রহস্যময়। এই রহস্যের কূল- কিনারা এখনো হয়নি। তবে কাজী মোতাহার হোসেনের স্মৃতিচারণায় এটুকু উন্মোচিত হয়, কোনো এক রাতে ফজিলাতুন্নেসার দেওয়ানবাজারের বাড়িতে একলা গিয়ে হাজির হয়েছিলেন নজরুল। এই বিদূষী নারীর কাছে প্রেম নিবেদন করেছিলেন নজরুল। কিন্তু এতকাল যে রমণীদের সঙ্গে তার সান্নিধ্যলাভ হয়েছিল তার একদম বিপরীতধর্মী ছিলেন ফজিলাতুন্নেসা। অন্য ধাতুতে গড়া এই নারী তাৎক্ষণিক তাকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, প্রত্যাখ্যানের ভাষা ও আচরণ ছিল রীতিমতোই কঠোর ও কর্কষ। এই আঘাত মানসিকভাবেই বিপর্যস্ত করেছিল কবিকে। (চলবে)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
©  2019 All rights reserved by  dailydinajpur.com
Theme Dwonload From Ashraftech.Com
ThemesBazar-Jowfhowo